সরকারি দলের হার ক্ষোভের প্রকাশ?

Spread the love

 

 

bd42fd5b02bad0f55e92748360291d84 5a3e0c7535384 - সরকারি দলের হার ক্ষোভের প্রকাশ?
রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান পরাজিত আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দীন আহমেদের সঙ্গে দেখা করেন। দুজনের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়

 

রংপুরে মেয়র পদে জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর ভোটের বিপুল ব্যবধান চমকে দিয়েছে সবাইকে। স্থানীয় ভোটার আর রাজনীতিকেরা বলছেন, সরকারি দলের প্রার্থী যে হারবেন, এটা তাঁরা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাই বলে প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে? 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয়তা এবং সরকারি দলের প্রার্থীর ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে নানা অভিযোগ তো রয়েছেই। তবে এর বাইরে বিভিন্ন কারণে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের কিছু ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, ভোটাররা তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। 
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, রংপুরের এই স্থানীয় নির্বাচন আগামী নির্বাচনগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তিনি বলেন, একই স্থান, একই দল এবং একই প্রার্থীদের মধ্যে এই নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। গত সিটি নির্বাচনের সঙ্গে এবারের নির্বাচনের দৃশ্যমান পার্থক্য হচ্ছে প্রতীকের ব্যবহার। তার মানে ভোটার ব্যক্তি নয়, প্রতীককে ভোট দিয়েছেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থীর (একজন বিদ্রোহী) ভোট মেলালে তাঁরা বিজয়ী প্রার্থী সরফুদ্দীনের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন। এবারও জাপার ব্যাপক জনসমর্থন প্রমাণিত হয়েছে। এবারের নির্বাচনে মূলত প্রতিযোগিতা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। এতে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের ভোট গত সিটি নির্বাচনের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমেছে। বিএনপির ভোট বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। এই বার্তা রাজনীতি ও আগামী নির্বাচনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 
জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক মেয়র সরফুদ্দীন আহমেদকে ৯৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন। অথচ নগরের ৩৩টি ওয়ার্ডে সাধারণ ও সংরক্ষিত মিলিয়ে যে ৪৪টি কাউন্সিলরের পদে ভোট হয়েছে, তাতে জাতীয় পার্টির মাত্র দুজন কাউন্সিলর জয়ী হয়েছেন। কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের ১৬, বিএনপির ৬ এবং জাসদের ১ জন জিতেছেন। বাকি ১৯ জন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। মেয়র পদে এবার দলীয় প্রতীকে ভোট হলেও কাউন্সিলর পদে তা হয়নি। 
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগে সমন্বয়হীনতা ছিল। পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করার কারণে সরফুদ্দীনের কাছে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলানোর একটা বিষয় ছিল। সব মিলিয়ে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান বড় হয়েছে। 
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, গতবারের তুলনায় সরকারি দলের প্রার্থী ৪০-৪১ শতাংশ ভোট কম পেয়েছেন। গতবার যাঁরা ভোট দিলেন, এবার তাঁরা কোথায় গেলেন? এই ফল প্রমাণ করে, রংপুরে আওয়ামী লীগের পাঁচ বছর আগের অবস্থান নেই। তিনি আরও বলেন, রংপুরে প্রায় ৬০ হাজার সংখ্যালঘু ভোট, ১৫ হাজার অবাঙালি ভোট। এই ৭৫ হাজার ভোটই-বা কোথায় গেল? 
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, দলীয় প্রার্থী সরফুদ্দীন আহমেদের ব্যবহার নিয়ে ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব ক্রমাগত বেড়েছে। এ জন্য তাঁদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে এতটা আগ্রহ ছিল না। 
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, প্রার্থী আর দলের মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা পূরণে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগেরও খুব একটা চেষ্টা ছিল না। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারে কেন্দ্রীয় নেতারা যেভাবে দৌড়ঝাঁপ করেছেন, তা-ও এখানে ছিল না। এর পেছনে দুটি বিবেচনা কাজ করেছে। প্রথমত, ভোটের আগে সরকারি সংস্থার জরিপে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর এগিয়ে থাকার তথ্য উঠে আসে। দ্বিতীয়ত, সরকারের শরিক জাতীয় পার্টিকে খুশি করার একটা চেষ্টাও ছিল। এ জন্যই রংপুরের ভোটে ‘হারলেও লাভ, জিতলেও লাভ’ এমন একটা মনোভাব আওয়ামী লীগের ছিল। 
এটা জেনে জাতীয় পার্টির অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেছেন, এ নির্বাচন সরকারি দলের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য ‘উপহার’। 
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, আগের নির্বাচনের তুলনায় রংপুরে নৌকার ভোট বেশ কমেছে। আবার ধানের শীষের ভোট বেড়েছে। বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিতে পারলে হয়তো তাদের ভোট আরও বাড়ত। এ ছাড়া ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনও ২৪ হাজার ভোট পেয়েছে, যা সরকারের পক্ষের ভোট নয়। তিনি মনে করেন, চাল-পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নেতা-কর্মীর বাড়াবাড়ি মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। ভোটের সময় এসব বিষয় হয়তো কাজ করেছে। 
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এরশাদ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ দেন। এরপরই ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, আওয়ামী লীগ হারলেও গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। 
সরকারের ছাড়ের বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক ছিল, প্রার্থী পুরো সিটি করপোরেশন এলাকা চষে বেড়িয়েছেন। এরপরও ছাড় দেওয়ার প্রশ্ন আসবে কেন? নির্বাচন কমিশনকে সরকার ভোট সুষ্ঠু হতে যে সহযোগিতা করেছে, এটাই বড় বিষয়। কাউন্সিলর প্রার্থী কম জেতার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁরা কম মনোযোগ দিয়েছেন। তাঁরা শুধু মেয়র নিয়েই ভেবেছেন।

পরাজয়ে ইতিবাচক দিক খুঁজছে আওয়ামী লীগ
রংপুরে বড় পরাজয়েও ইতিবাচক দিক খুঁজছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারকদের প্রধান স্বস্তির বিষয়, বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক কম ভোট পেয়েছে। তাই বিএনপি এটাকে পুঁজি করে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা নিতে পারবে না। বরং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুনাম অর্জন করতে পেরেছে সরকার। এর বাইরে সরকারের শরিক জাতীয় পার্টিকেও খুশি করা গেছে। 
দলীয় সূত্র বলছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জোটের বর্জনের মধ্যে জাতীয় পার্টির সমর্থন মিলেছিল। একটা সময় পর্যন্ত তাদের বিএনপির বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ভাবনাও ছিল। আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ বা বর্জন-দুই ক্ষেত্রেই জাতীয় পার্টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। 
সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রংপুরের এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার আপস হয়েছে বলে যেসব কথা আকাশে-বাতাসে শোনা যায়, ভোটের হিসাব কিন্তু তা বলে না। এখানে বিএনপির অবস্থা কখনোই ভালো নয়, তারপরও প্রায় ১৫ হাজার ভোট বেড়েছে। জাতীয় পার্টির ভোট আগের তুলনায় বেড়েছে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে গোটা উত্তরাঞ্চলে এর সুফল হয়তো জাতীয় পার্টি পাবে। তখন তা আওয়ামী লীগ বা বিএনপির জন কষ্টকর বিষয় হবে।

ভোট কমেছে নৌকার, না সরফুদ্দীনের
এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরফুদ্দীন আহমেদের ভোট কমেছে, নাকি নৌকার? এই আলোচনা রংপুরের সর্বত্র। কারণ, গত নির্বাচনে সরফুদ্দীন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৬ হাজার ভোট। এবার পেয়েছেন ৬২ হাজার ৪০০। ভোট কমেছে ৪৩ হাজারের বেশি। কেউ কেউ বলছেন, গত নির্বাচনের বাড়তি ভোটগুলো ছিল সরফুদ্দীনের নিজের। আবার কেউ কেউ বলছেন, সরফুদ্দীনের ভোট কমার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভোটও কমেছে। এর মূল কারণ দলের নিষ্ক্রিয়তা। 
এদিকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগও দলীয় কোন্দল মেটাতে তৎপর ছিল না। কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন, তথ্য-গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেনসহ সহযোগী সংগঠনের নেতারা নামকাওয়াস্তে রংপুরে এসে প্রচার চালান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংসদ বলে নির্বাচনী এলাকায় আসেননি। তাঁরা সৈয়দপুরে অবস্থান করে কিছুটা তৎপরতা চালান। 
তবে পরাজয়ের ব্যবধান অনেক বড় হওয়ার কারণে এখন স্থানীয় আওয়ামী লীগ কিছুটা শঙ্কিত। তাদের মূল ভাবনা, বড় পরাজয়ের কারণে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ রুষ্ট হয় কি না। এর বাইরে স্থানীয় রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির কাছে কোণঠাসা হওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব কমে যাওয়ার ঝুঁকির কথাও ভাবছেন কেউ কেউ। 
জানতে চাইলে রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, নৌকার ভোট কমেনি। সরফুদ্দীন যে ভোট পেয়েছেন, সেটা আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। সাধারণ মানুষের ভোট তিনি পাননি। 
দলের সঙ্গে সরফুদ্দীনের দূরত্বের বিষয়টি সম্পর্কে মহানগর সাধারণ সম্পাদক বলেন, দূরত্ব ছিল, এটা ঠিক আছে। অন্য কাউকে প্রার্থী করা হলে হয়তোবা জয় আসত।

ব্যক্তি মোস্তাফিজার জনপ্রিয়, বিএনপির প্রার্থী-সংকট
বিজয়ী মেয়র মোস্তাফিজার রহমান সবার সঙ্গে মিশতে পারেন-এমন ধারণা থেকে তাঁর কিছু ব্যক্তিগত ভোট রয়েছে। এর সঙ্গে লাঙ্গল ভোট ও দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের প্রভাব পড়েছে। গত নির্বাচনে দল থেকে বহিষ্কার হয়েও তিনি প্রায় ৭৮ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। 
দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদসহ শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নেতা রংপুরে অবস্থান করেন। তাঁরা প্রচারে অংশ না নিলেও ভোটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। দলীয় প্রার্থীকে উৎসাহ দেন। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামীর ভোটও তাঁর বাক্সে পড়েছে বলে জাতীয় পার্টির অনেকে মনে করেন। এ ছাড়া মোস্তাফিজার জিতে যাচ্ছেন, ভোট নষ্ট করা ঠিক হবে না-এমন ধারণা থেকেও কিছু ভোট পড়েছে। 
আর বিএনপি বরাবরই রংপুরে দুর্বল। দলে একাধিক প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু জেতার মতো অবস্থা নেই। ভোটে দাঁড়ালে হয়রানির শিকার হতে হবে-এই ভেবে অনেকে প্রার্থী হতে চাননি। কাওছার জামানের আগ্রহও ছিল, আগেরবার প্রায় ২১ হাজার ভোটও পেয়েছিলেন। এ জন্য অনেকটা বাধ্য হয়েই দলীয় নেতৃত্ব তাঁকে প্রার্থী করেছেন। তিনি যে ৩৫ হাজার ১৩৬ ভোট পেয়েছেন, তা দলের একেবারে কট্টর সমর্থকদের। 
রংপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রইস আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, অন্যরা যেভাবে প্রচার করেছে, সেটা বিএনপি পারেনি। কারণ, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রচুর হয়রানিমূলক মামলা রয়েছে। ফলে মানুষের কাছে পৌঁছাতেই পারেননি তাঁরা।