বারান্দা

Spread the love

লেখিকাঃ অর্না খান
আমাদের বাড়িটা ছিলো দোতালা।উপরের ঘরে আমি আর দিদিভাই থাকতাম।দিদিভাইয়ের বিয়ের পর আমি একাই থাকতাম।পিছনের বারান্দাটা খুব পছন্দের ছিলো।ওখানে একটাই বাড়ি ছিলো।সুজয় দা থাকতো।পুকুরের কাছে বসে মাছ ধরতো আর আমি অবাক চোখে দেখতাম।লোকটাকে ভাড়ি অদ্ভুত লাগতো।মা বাবাও মারা গেছেন।একা একা থাকতেন।তবুও কখনো মুখ কালো করতে দেখিনি সবসময় হাসতো।আমার থেকে হাতে গোনা বারো বছরের বড় ছিল।তবুও অবাক করে তাকেই ভালো লাগতো।মা ওনাকে পছন্দ করতেন না বিধায় ওতটা ঘনিষ্ট ছিলাম না আমরা।তবুও কিছু হলেই উনি ছুটে আসতেন আমাদের বাড়িতে।উনি যানতেন কেউ ওনাকে পছন্দ করেন না তবুও আসতেন।
একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে ওনার সঙ্গে হঠাৎ দেখা।বললেন,,
–মিনু বাড়িতে যাচ্ছিস?
–হ্যা সুজয়দা।কেন?
–হিরুকাকাদের বাড়ির ওপাশে যে মেলা বসেছে,গিয়েছিলি?
— নাহ,মা বারণ করেছে।
–যাবি আমার সাথে?বেশিক্ষন লাগবে না।কাকিমা জানবে না।
–আচ্ছা চলো তাহলে।আমায় রেশমি চুড়ি কিনে দেবেতো?
–হাহাহা,আচ্ছা চল।
সেদিন মেলা থেকে ফিরে চুড়ি হাতে দিদিভাইয়ের কাছে ধরা পড়ি।তখন দিদিভাইয়েরা আমাদের বাড়িতে এসেছিল।
দিদিভাইয়ের কাছে সেদিন বড্ড লাজুক সুরে বলেছিলাম,,
–দিদিভাই সুজয়দাকে আমার ভালো লাগে।
–মিনু কি বলছিস কি?
–কেন দিদিভাই?হ্যা আমি জানি উনি আমার থেকে অনেক বড় কিন্তু তাতে কি আসে যায়?তুমি বাবাকে বলো না?
–মিনু ওসব আবেগ।ভুলে যাও।বাবা তোমার বিয়ে ঠিক করেছে।আর যানই তো বাবার কথাই শেষ কথা।
–আমাকে তো কিছু জানানো হয়নি।
–এখানে জানানোর কি আছে?এইতো জানলে।শোন মিনু,এখন তোর উঠতি বয়স দু একজনকে ভাল লাগবেই।ওসব ভুলে যা।দেখবি একটা সময় আসবে যখন তুই নিজেও বুঝতে পারবি আর আমাকে মনে করবি।
সেদিন শুধু কেঁদে ছিলাম।কিচ্ছু বলিনি আর কাউকে।চুপচাপ সায় দিয়েছিলাম বিয়েতে।
মাঝে একদিন ছোট পিসি অসুস্থ থাকায় সবাই ও বাড়ি যায়।আমি যাইনি কেবল।মায়েরা সবাই যাওয়ার পরপরই বৃষ্টি শুরু হয়।আমি পিছনের বারান্দায় গিয়ে বসি।হঠাৎ সুজয়দা ভিজতেভিজতে এসে বললো,,
–কিরে মিনু তোর বিয়ের কথা চলছে নাকি?
–জানিনা।
–আয় বৃষ্টিতে ভিজবি?
আমি কিছু না বলেই ওপাশ থেকে দৌড়ে গিয়ে সুজয়দাকে জড়িয়ে কেঁদে দিলাম।সেদিন সুজয় দা কেবল আমার কপালে একটা চুমু এঁকে ঘরে চলে গিয়েছিলো।
আচ্ছা সেদিন কি সুজয় দা কিছু বুঝতে পেরেছিল নাকি আমার মনের ভুল?
দুমাস পড়ে বেশ জমজমাটভাবে আমার বিয়ে হয়।সেদিন দিদির উপর খুব রেগে ছিলাম।আমি সেদিন প্রথমবার সুজয়দার মুখ কালো দেখি।লোকটা কি তাহলে আমায় ভালবাসতো?কি জানি?হয়তো বাসতো,হয়তো বা না।আমার বিয়ের পর মা বাবা আর ও বাড়িতে থাকেনি।কলকাতাতেই চলে আসে।
আজ পাঁচ বছর পর আমি আমার বারান্দায় এসে বসেছি।আমার একটা ছেলে আছে।দু বছরের।সুজয়দার বাড়িটা এখনো আছে,নেই মানুষটা।শুনেছি আমার বিয়ের পর থেকে তাকে আর কেউ দেখেনি।আজ দিদিভাইয়ের কথাটা মনে পড়ছে,মেলেনি দিদিভাইয়ের কথা।
অতঃপর সে হলো আমার,
আমার আর হওয়া হলো না তার।
(সমাপ্ত)

What is Your Opinion?