লাল সিঁদুর

Spread the love

লেখিকাঃ অর্না খান
ওপাড়ার আরুদাকে বাড়ির সবাই খুব পছন্দ করতেন।পুরো নাম ছিলো আরিফ আবদুল্লাহ।সবাই ভালবেসে আরু ডাকতো।বয়সে বড় হওয়াতে আরু দা ডাকতাম।আমরা ছিলাম সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবার,তবে আরুদা ছিলো মুসলিম পরিবারের।আমাদের বাড়ির সবাই ওকে খুব পছন্দ করতেন।কিন্তু আমার খুব বিরক্ত লাগতো।ছেলেটা শুধু দেখলেই ক্যাবলাকান্তের মতো চেয়ে থাকতো।অসহ্য লাগতো আমার।তবে বাড়িতে সেই ছিলো পাড়ার সবথেকে আদর্শ ছেলে।
সে যেমন শান্তশিষ্ট ছিলো,আমি ঠিক তেমনি রগচটা,জেদি ছিলাম।তবে ভোরের শিশির আমার খুব ভালো লাগতো।শিশিরে ভরা চারিপাশ খুব ভালো লাগতো।তেমনি এক ভোরে কেবলি গাছে পানি দেয়া ধরেছি,আর হঠাৎ পিছন থেকে আরুদা বললো,,
–যারা ফুল গাছে পানি দেয় তারা বুঝি ফুলের মতোই পবিত্র হয়।যেমনটা তুমি।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম তাকে দেখে।ধোয়াটে রঙের পান্জ্ঞাবী,গালভরা দাড়ি,চোখ ভরা বিষ্ময় আর পুরো চেহারাময় এক মনকাড়া পবিত্র হাসি।এই প্রথম এই অসহ্য লোকটাকে আমার ভালো লেগেছে।হঠাৎ যেন রাজ্যের লজ্জা এসে ভর করলো আমার ওপর।আমি কোন কথা না বলে ছুটে ঘরে চলে এলাম।জানিনা তখন আমার কি হলো?আমি ঘরে এসে চুপটি মেরে বসে রইলাম।এরপর যতবারই লোকটা আমার সামনে এসেছে আমার কেমন একটা লাগতো।হঠাৎ দু-তিনদিন সে নিরুদ্দেশ।তাকে দেখা যাচ্ছিলো না কোথাও।আমি অস্থির হয়ে গেলাম।কেন জানি ভীষনরকম কষ্ট হচ্ছিলো।সেদিন বিকেলে ঘরে মনমড়া হয়ে বসে ছিলাম।হঠাৎ ছোট ভাইটা এসে বললো,,দিদিভাই তোর চিঠি।আমি চমকে গেলাম,কার চিঠি?কিসের চিঠি?চিঠিটা খুলে পড়তে লাগলাম,
প্রিয় ঈন্দীরা,
আমি জানিনা কেন তুমি আমাকে এতোটা অসহ্য ভাবো।তবে আমি তোমাকে ভোরের ফুলের মতোই পবিত্র ভাবি।তুমি জানোনা আমি রোজ সকালে তোমায় লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি।কাল থেকে আর তোমাকে দেখা হবে না।চলে যাচ্ছি এখান থেকে।
ভালো থেকো,
ইতি
তোমার অসহ্যের কারন।
আমি চিঠিটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম।একছুটে অপুদার বাড়িতে গিয়ে সোজা তার রুমে গিয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলাম।সে তখন নির্বাক।আমি কান্নাজড়িত কন্ঠে বললাম,”আমাকে মাফ করে দাও।তুমি যেও না আরুদা।আমি জানিনা তোমাকে ভালবাসি কি না,তবে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমার তোমাকে দরকার,ভীষন দরকার।”
সেবার আর ও কোথাও যায় নি।এরপর থেকে আমাদের মাঝে আর কোনো জড়তা ছিলো,ছিলো কেবল ভালবাসা।ও সবসময় একা কথা বলতো,,
–ঈন্দু তুমিতো হিন্দু আমিতো মুসলিম।এই সমাজ কি মানবে?
আমি কখনো গভীরভাবে ভাবিনি।মজা করে বরাবরই বলতাম,
–সংসার কি সমাজের সাথে করবে?আমার সাথে করবে,আমি মানলেই হলো।
আমরা প্রত্যেক বিকেলে পুকুরপাড়টায় দেখা করতাম।হাত ধরে বসে থাকতো আরু আমার।একদিন বিকেলে বাবা আমাকে ডেকে বললেন,ঈন্দু তৈরি হও তোমাকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে।বাবাকে বড্ড ভয় করতাম।আমার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো।কি করবো এবার?আমাকে তৈরি করে ছেলেপক্ষের সামনে নিয়ে যাওয়া হলো।তারা আমাকে দেখে গেলো।
রাতে মা এসে বললো,
–ঈন্দু ছেলেটা ভালো,বিলেত নিয়ে যাবে তোকে বিয়ের পর।অনেক ভালো থাকবি।
আমি বললাম,
–মা এসব এখন না করলেই নয়?
–ছেলেপক্ষ তোকে পছন্দ করেছে।সামনের সপ্তাহে তোর বিয়ের তারিখ ঠিক করেছে তোর বাবা।
এ কথা বলে মা চলে গেলেন।আমি সারারাত শুধু কাঁদতেই লাগলাম।পরের দিন থেকেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু।সব দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আরুকে।বেচারার মুখের দিকে তাকাতে পারি না আমি।দুপুরে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পুকুরপাড়ে দেখা করলাম।আমি অনবরত কাঁদতেই লাগলাম।আরু আমাকে বললো,
–কাঁদলে যে কষ্ট হয়।
–আমাকে নিয়ে যাও আরু।এ বিয়ে আমি করবো না।
–কোথায় নিয়ে যাবো বলো?আমার যে হাত বাঁধা।তোমার বাবার ভরষার হাত ভাংতে বলো না।সমাজ কোনদিন কি মানবে?তুমি পারবে তোমার বাবাকে কষ্ট দিতে?
–আর আমি?
–তুমি অনেক ভালো থাকো।অনেকটা।
–আর আমার আরু?
–তোমার বিয়ের পর কলকাতাতে চলে যাবো।অনেকদুরে,তোমার স্মৃতি থেকে দুরে।
–আরু,সমাজ কেন এত খারাপ?
–ঈন্দু সমাজ খারাপ না,খারাপ এই সমাজের মানুষগুলো।
–তোমাকে আর পাওয়া হলো না আমার।
–তোমার সকল অপ্রাপ্তিতেই থাকবো আমি।যাও বাড়ি চলে যাও।
আমি কেবল আমার অশ্রুসিক্ত চোখে একটা কথাই বলে আসলাম,
–আরু,আমার আর ভাল করে বেঁচে থাকা হলো না।
এরপর আর কথা হয়নি আমাদের।ও সবকাজ হাসিমুখেই করতো।আমার বিয়ের দিনটাতেও আমি দেখেছি আমার আরু হাসিমুখে কাজ করছে।
একে একে বিয়ের সব কাজ শুরু হলো।আমার শুভদৃষ্টি হলো,মালাবদল হলো,সাঁতপাকও হলো।এবার সিঁদুর দেবার পালা।আমাকে আমার জীবন থেকে আলাদা করার পালা।তখনো দেখেছি আরুর হাসি মুখ আর অশ্রুসিক্ত চোখ।আমার সিঁথিতে সিঁদুর উঠলো লাল রক্তের মতো রঙের সিঁদুর।আমি বুঝতে পারলাম কোথাও কেউ একজন আছে যার বুক থেকে রক্তপাত হচ্ছে লাল রক্ত ঠিক যেন সিঁদুর লাল।
#সমাপ্ত

What is Your Opinion?